মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

গ্রাম আদালত

গ্রাম আদালত

 সংকলনে ঃ মোঃ এরশাদুন্নবী এরশাদ(  উদ্যোক্তা গুনাইগাছ ইউ আই এস সি)

 

স্হানীয়ভাবে পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের বিচার প্রাপ্তির কথাবিবেচনায় নিয়ে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে প্রণীত হয় গ্রাম  আদালতঅধ্যাদেশ। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ০৯ মে ১৯ নং আইনের মাধ্যমে প্রণীত হয় গ্রামআদালত আইন ।এ আইনের মূল কথাই হলো স্হানীয়ভাবে স্বল্প সময়ে বিরোধনিষ্পিত্তি।নিজেদেন মনোনীত প্রতিনিধিদের সহায়তায় গ্রাম আদালত গঠন করে বিরোধশান্তি পূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও স্হিতিশীলতা বজায় থাকেবলেই এ আদালতের মাধ্যমে আপামর জনগণ উপকৃত হচ্ছেন ।

গ্রাম আদালত বলতে কী বুঋায় ?

গ্রামালের কতিপয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেওয়ানী ও ফেৌজদারী বিরোধ স্হানীয়ভাবেনিষ্পত্তি করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় যে আদালত গঠিত হয় যে আদালতকেগ্রাম আদালত বলে ।

কোন আইনের আওতায় গ্রাম আদালত গঠিত হবে ?

গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ এর আওতায় গ্রাম আদালত গঠিত হবে ।

গ্রাম আদালতের উদ্দেশ্য কী?

কম সময়ে, অল্প খরচে, ছোট ছোট বিরোধ দ্রুত ও স্হানীয়ভাবে নিষ্পত্তি করাই গ্রাম আদালতের উদ্দেশ্য ।

গ্রাম আদালত আইন কত তারিখ হতে কার্যকর হয়েছে ?

০৯ মে ২০০৬ তারিখ হতে গ্রাম আদালত আইন কার্যকর হয়েছে ।

গ্রাম আদালত আইন কীভাবে গঠিত হয় ?

৫(পাচ) জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয় । এরা হলেন সংশ্লিষ্টইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আবেদনকারীর পক্ষের ২ জন প্রতিনিধি (১ জন ইউনিয়নপরিষদের মেম্বার এবং ১ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি) প্রতিবাদীর পক্ষের ২ জনপ্রতিনিধি (১ জন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার এবং ১ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি)

ফৌজদারী বিষয়

১। চুরি সংক্রান্ত বিষয়াদি

২। ঋগড়া -বিবাদ

৩। শক্রতামূলক ফসল ,বাডি বা অন্য কিছুর ক্ষতি সাধন

৪। গবাদী পশু হত্যা বা ক্ষতিসাধন

৫। প্রতারণামুলক বিষয়াদি

৬। শারিরীক আক্রমণ ,ক্ষতি সাধন, বল প্রয়োগ করে ফুলা ও জখম করা ।

৭। গচিছত কোনো মুল্যবান দ্রব্য বা জমি আত্নসাৎ

দেওয়ানী বিষয়

১। স্হাবর সম্পতি দখল পুনরুদ্ধার

২। অস্হাবর সম্পত্তি বা তার মূল্য আদায়

৩। অস্হাবর সম্পত্তি ক্ষতিসাধনের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়

৪। কৃষি শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরী পরিশোধ ও ক্ষতিপুরণ আদায়ের মামলা

৫। চুক্তি বা দলিল মূল্যে প্রাপ্য টাকা আদায়

 গ্রাম আদালতের জরিমানা :
১৯৭৬ সালের গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এটি ফৌজদারি ওদেওয়ানি দু’ধারাতেই বিচার করার কর্তৃত্ব রাখে।এক্ষেত্রে জরিমানা বাক্ষতিপূরণের মূল্যমান ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। ২০০৬সালের মে মাসে ১৯ নং আইনের অধীনে ১৯৭৬ সালের গ্রাম আদালত অধ্যাদেশের সংশোধনহয়ে যে আইনটি প্রণীত হয়, সেটি কম-বেশি আগের আইনটির মতোই।তবে এখানে প্রধানপরিবর্তনটি এসেছে মামলার ক্ষতিপুরনের আর্থিক সীমায়, যা ৫ হাজার টাকা থেকে২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। ১৯৭৬ এবং ২০০৬ উভয় আইনেই এর গঠন, পরিচালনা, মামলা যাচাই-বাছাই, ডিক্রি জারি এবং কার্যবিবরণীর নথি সংরক্ষণের কাজগুলোকেইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যে সকল অভিযোগের বিচার গ্রাম আদালতে হয় নাক) ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেঅভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।
খ) দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে
• যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকে;
• বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা (সালিশি চুক্তি) করা হয়ে থাকলে;
• মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারি কর্মচারি হয়ে থাকলে;
*কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রাম আদালতে কোন মামলা দায়ের করা যাবে না।
গ্রাম আদালতের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র মানুষ জজ আদালতে জমে থাকা মামলারঘানি এবং হয়রানির হাত থেকে মুক্তি পাবে।গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ ও সালিসীআদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী বিচারসম্পাদনের দায়িত্ব দিয়ে এ আদালত গঠন করা হয়েছে। ফলে শহরে না গিয়ে ঘরে বসেইগ্রাম আদালতের সুবিধা পাওয়া যায়। আদালত আইন-১৯৭৬ এবং সংশোধিত গ্রাম আদালতআইন ২০০৬ অনুযায়ী এই আদালতে ফৌজদারি ও দেওয়ানী উভয় ধরনের বিরোধ মিমাংসারসুবিধা পাবেন গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি। যেমন:
• কম সময়ে ও নামমাত্র খরচে ন্যায্য বিচার পাওয়া;
• এ আদালতে উকিল নিয়োগের সুযোগ নেই বলে বিচার প্রক্রিয়ায় গরিব লোকেরা সহজে প্রবেশ করতে পারে;
• গ্রাম আদালতের বিচার পদ্ধতি আনুষ্ঠানিক হলেও মীমাংসা বন্ধুসুলভ হয়;
• গ্রাম আদালত আইনি পদ্ধতি হলেও বিবাদমান পক্ষসমূহ এটিকে সামাজিক সংগঠন মনেকরে এবং গ্রাম আদালতের রায়কে সামাজিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করে;
• গ্রাম আদালতের রায়ের পরও বিবাদমান পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সামাজিক বন্ধন অটুটথাকে যা ম্যাজিস্ট্রেট বা উচ্চ আদালতে মামলা চলাকালীন বা রায়ের পর বিদ্যমানথাকে না;
• গ্রাম আদালতের বিচারকগণ স্থানীয় হওয়ায় রায় বাস্তবায়ন করা সহজ হয়;
গ্রাম আদালতের আইনগত ভিত্তি থাকায় এই আদালতের রায় উচ্চ আদালতে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
সরকারী এই সেবা পেতে একটি সাদা কাগজে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জানাতে হয়।
গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচারচেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪টাকা (দেওয়ানি মামলা হলে) অথবা ২ টাকা (ফৌজদারি মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদনকরতে পারেন। আবেদনপত্রে যেসব বিবরণ থাকতে হবে-১.যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;
২.আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;
৩.যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;
৪.সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবির প্রকৃতি ও পরিমাণ;
৫.প্রার্থিত প্রতিকার;
৬.আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন; উল্লেখ্য, কোনঅপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগঅমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখেআবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।
অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সকলেই এই গ্রাম আদালতের সুবিধা পাবেন।
১ জন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দুজন সদস্য নিয়েমোট ৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত ২জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদেরচেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে যদি চেয়ারম্যান কোনকারণবশতঃ তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তার নিরপেক্ষতা সম্পর্কেআপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্বপালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থহন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোনপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেনতাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

বিচারের আবেদন করার পর বাদী এবং বিবাদী উভয়ইকে গ্রাম আদালতের দুজন বিচারকমনোনীত করতে হয়। মনোনীত সদস্যদের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেনএবং অন্যজন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি হবেন ।

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়। যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারাসিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ করার বিধান রয়েছে। এবংআদালতের রায়ের পর ডিক্রি জারি হয়।গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার-এক (৪:১) ভোটে গৃহীত হয় বাচারজন সদস্যের উপস্থি'তিতে তিন-এক(৩:১) সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়, তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্তসিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপিল চলবে না;
কোন কারনে গ্রাম আদালতের সেবা পাওয়া না গেলে-
• বিধান অনুযায়ী যদি তিন-দুই ভোটে কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্তবাধ্যতামূলক হবে না। সিন্ধান্ত ঘোষণার ত্রিশ দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত)এবং দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ)-এর আদালতে আপিল করতেপারবেন;
• গ্রাম আদালতের ডিক্রি বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ৬ মাসের অধিক হবে না।

গ্রাম আদালত অর্ডিনেন্স, ১৯৭৬ এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায়বিচারকার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রাম আদালত কর্তৃক ফৌজদারিবিচারযোগ্য ধারাগুলো হলো- দন্ডবিধির ১৬০, ৩২৩, ৩৩৪, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫২, ৩৫৮, ৪২৬, ৫০৪, ৫০৬ (প্রথম অংশ), ৫০৮, ৫০৯ এবং ৫১০ ধারা। এ ছাড়াও ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৩, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪২৭, ৪২৮, ৪২৯ (পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হলে)এবং ১৪১, ১৪৩, ১৪৭ গবাদী পশু সম্পর্কিত (আসামী দশ জনের নিচে হলে), ১৮৭১ এর২৪/২৬/২৭ ধারা।
দেওয়ানি মামলাগুলো হলো- (১) কোনো চুক্তি বা অন্য কোন দলিল মুলে প্রাপ্যটাকা আদায়ের জন্য মামলা; (২) কোনো অস্থাবর সম্পত্তি বা উহার মূল্য আদায়েরমামলা; (৩) কোনো স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হওয়ার এবং বছরের মধ্যে উহার দখলপুনরুদ্ধারের জন্য মামলা; (৪) কোনো অস্থাবর সম্পত্তি বেআইনিভাবে লওয়া বাবিনিষ্ট করার দরুণ ক্ষতি পূরণের মামলা; (৫) গবাদী পশুর অনাধিকার প্রবেশেরদরুণ ক্ষতি পূরণের মামলা এবং (৬) কৃষি শ্রমিকের পরিশোধযোগ্য মজুরী ও ক্ষতিপূরণের মামলা (উপরেল্লিখিত মামলা সমূহের যখন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তিরমূল্যমান ২৫,০০০/- টাকা বা তার কম হবে)।

ছবি